দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের মুদ্রাবাজারের প্রভাবক উপাদানগুলোয় বড়ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহের পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালার পার্থক্যের কারণে এ অঞ্চলের মুদ্রাগুলোর বিনিময় হারে দেখা যাচ্ছে দ্বিমুখী গতি। একদিকে বিনিয়োগের জোয়ার ও স্থিতিশীল অর্থনীতির ওপর ভর করে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও থাইল্যান্ডের বাথের বিনিময় হার শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত দুর্বলতায় চাপের মুখে পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়া ও ফিলিপাইন পেসো। মুদ্রার বিনিময় হারের এ ভিন্নমুখী প্রবণতা আগামীতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রফতানি প্রতিযোগিতায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিক্কেই এশিয়ার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত। গত মাসে এক ডলারের বিপরীতে ৪ দশমিক ৫০ থেকে কমে ৩ দশমিক ৯০ রিঙ্গিতে নেমেছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে রিঙ্গিতের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
মূলত সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) জোয়ার এবং ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি রিঙ্গিতকে চাঙ্গা করেছে। এছাড়া জোহর-সিঙ্গাপুর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো বড় উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিবিদ ডরিস লিউ জানান, এআই খাতের প্রসার এবং ডাটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে মালয়েশিয়ার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় রিঙ্গিতের চাহিদা বেড়েছে।
একইভাবে ডলারের বিপরীতে থাই বাথের বিনিময় হারও বেশ শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। গত মাসে ডলারপ্রতি বাথের বিনিময় হার ৩১-এর নিচে নেমে আসে, যা ২০২১ সালের জুনের পর সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। মূলত ইলেকট্রনিকস পণ্য রফতানি থেকে আসা আয় ও বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাথকে চাঙ্গা রেখেছে। তবে মুদ্রার এ শক্তিশালী বিনিময় হার রফতানিমুখী দেশ হিসেবে থাইল্যান্ডের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী একনিতি নিতিথানপ্রভাস জানান, থাইল্যান্ড একটি নিট রফতানিকারক দেশ হওয়ায় বাথের বিনিময় হার বৃদ্ধি দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে। জানুয়ারিতে ডলারের বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়ার বিনিময় হার কমে ১৭ হাজারে ঠেকেছে। সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় দেশটি থেকে বিনিয়োগকারীরা পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানি খাত মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামালনির্ভর। উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় পণ্য না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে রুপিয়ার বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে বহুমুখী সংকটে রয়েছে ফিলিপাইনের পেসো। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর এবং সুদহার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয় নীতি পেসোকে চাপে ফেলেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুদহারের ব্যবধান কমে আসায় বিনিয়োগকারীরা ফিলিপাইন থেকে পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন।
অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক। ২০২৬ সালেও পেসোর বিনিময় হারের ওপর এ চাপ বজায় থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মুদ্রাবাজারের এ মেরুকরণ আসিয়ান অঞ্চলের রফতানি প্রতিযোগিতাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার পাম অয়েল ও কৃষি খাতের মতো সংবেদনশীল খাতগুলো রিঙ্গিতের উচ্চমূল্যের কারণে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আগামীতে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।